মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহাসিক বাঁকবদল ।। Historical turning point in the Middle East

মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহাসিক বাঁকবদল
Historical turning point in the Middle East

Historical turning point in the Middle East
মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহাসিক বাঁকবদল
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ ইসরাইলের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে সুস্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে । প্রথম উপসাগরীয় আরব দেশ হিসাবে আরব আমিরাত ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঘোষণা দেয় আগস্ট ২০২০ । আর স্বাধীন-সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে সে পথেই পা বাড়ায় আর এক উপসাগরীয় দেশ বাহরাইনও । ইসরাইলের সাথে আরব দেশগুলোর এর সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ১৯৭৯ সালে এবং ১৯৯৪ সালে জর্ডানের সাথে চুক্তির মাধ্যমে ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার তিন বছর পর ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ শাসিত ফিলিস্তিনে ইসরাইলের জন্ম হয় । পশ্চিমা বিশ্বের বানানো এক রাষ্ট্রকে প্রথমদিকে মেনে নেয়নি আরবরা । এজন্য ১৯৫৬, ১৯৬৭ ও সর্বশেষ ১৯৭৩ সালে আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে যুদ্ধ হয় ইসরাইলের । প্রতিবারই আরবরা পরাজিত হয় । এরপর থেকেই ইহুদীদের কাছে জমি হারাতে বসে ফিলিস্তিনিরা । আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ফিলিস্তিন-ইসরাইল দুটি রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে সংঘাত মেটানোর চেষ্টা করলেও ইসরাইলের গোয়ার্তুমির কারণে তা এখনও সফলতার মুখ দেখেনি ।

ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় আরব দেশগুলোর প্রধান তিনটি শর্ত দিয়েছিল । যুদ্ধের সময় আরব দেশগুলোর দখল করা জমি ছেড়ে দেয়া, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ও স্বীকৃতি এবং ফিলিস্তিনের দখল করা জমি হস্তান্তরের সেই শর্তের কোনটাই পূরণ না হওয়ার পরও আরবদেশ গুলো ইহুদি রাষ্ট্রটির সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলছে । এরপরও আরব রাষ্ট্রগুলো বলছে এ সম্পর্ক ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিতে এবং অবৈধ বসতি স্থাপন বন্ধ করতে ইসরাইলের ওপর চাপ প্রয়োগ করবে, কিন্তু তা যুক্তিতে টেকে না । কেননা ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যসহ আফ্রো-এশীয় ১৬ টি মুসলিম প্রধান দেশের সাথে ইসরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও তা কিন্তু ইসরাইলের উপর চাপ সৃষ্টি করেনি এবং ফিলিস্তিনিদের কোন কাজে আসেনি ।

এর মধ্য দিয়ে আরব আমিরাত ইসরাইল বাহরাইনের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কথা বলা হলেও এর নেপথ্যের অন্যতম একটি বিষয় হল এক পক্ষের অস্ত্রের ব্যবসা, অন্য পক্ষের সামরিক ক্ষমতা বৃদ্ধি । সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন “আব্রাহাম আকর্ডস” খ্যাত এ চুক্তিতে সম্মত দেয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক অস্ত্র আমিরাতে আসার পথ সুগম হবে এটাই বিজ্ঞ মহলের অভিমত ।

আরবলীগ অনুমোদিত ২০০২ সালের আরব পিস ইনিশিয়েটিভ অনুসারে, ফিলিস্তিনের যেসব জায়গা দখল করেছে, সেগুলো ছেড়ে দেয়ার বিনিময়ে দেশটির সাথে আরব ও এ অঞ্চলের ইসলামী দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে শর্ত ছিল তা ইসরাইলের সাথে আরব আমিরাত ও বাহরাইনের চুক্তির মাধ্যমে ভেস্তে যায় বা দেওয়া হয় । কেননা আরবলীগ তুরস্ক ও ইরানের আগ্রাসন পর্যবেক্ষণের জন্য যে স্থায়ী উপ-কমিটি গঠন করেছে তার সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাদের নতুন লড়াই শুরু হচ্ছে ইরান ও তুরস্কের বিরুদ্ধে । এ লক্ষ্যেই আরব বিশ্বের রাজতন্ত্র সরকারগুলো তাদের শত্রুর যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছে তাতে ইসরাইল আর আরবলীগের শত্রু নয়, শত্রু হলো ইরান ও তুরস্ক । আর সেটির আয়োজন হচ্ছে ইসরাইলের ইচ্ছা অনুসারে । বলা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাত অপারেশনাল স্তরে ইসরাইল এর মদদে আরব বিশ্ব মুসলিম বিশ্ব থেকে ইরান ও তুরস্ককে বিচ্ছিন্ন করতে অনুঘটকের কাজ করছে ।

মধ্যপ্রাচ্যে একনায়কতন্ত্র ও রাজতান্ত্রিক সরকারগুলো গণতন্ত্রকে তাদের ক্ষমতার সামনে প্রধান প্রতিপক্ষ মনে করে । আরব বসন্তের পর থেকে এসব দেশ তুরস্ক ইরান এর পাশাপাশি গণতন্ত্রকামী ইসলামিস্টদেরও প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করতে থাকে । ধারণা করা হয় যে, বাহরাইনের পর ওমান একই পথে যেতে পারে । সৌদি আরব ও সুদানের কথা বলা হলেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া দেশ দুটির পক্ষে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়া সহজ হবে না । এরপরও সেটি ঘটলে মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন মেরুকরণ পারে ।

আর তুর্কি সমর্থনপুষ্ট হামাস এবং ইরান সমর্থনপুষ্ট হুথি-হিজবুল্লার মধ্যে সমঝোতায় মেরুকরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় । ইসরাইল উপসাগরীয় দেশ ও মিত্রদের নিয়ে যত চাপ বাড়াবে তুরস্ক-ইরানের মধ্যে ঐক্য ততটাই বাড়বে । তুর্কি-পার্সির সাথে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, আজারবাইজান, তুর্কেমেনিস্তান সহ এশিয়ার দেশ কয়টি মুসলিম রাষ্ট্রও থাকতে পারে । এটি হলে মুসলিম বিশ্ব এমন ভাবে ভাগ হবে যাতে একদিন গণতন্ত্রচর্চার দেশগুলো এবং ব্রাদারহুডের মত জনসমর্থিত রাজনৈতিক শক্তি থাকবে । আর অন্যদিকে থাকবে ইসরাইলের নিরাপত্তা আশ্রয় অধীনস্থ কয়েকটি আরব দেশ এবং তাদের প্রভাব বলয়ের রাষ্ট্রগুলো । এক্ষেত্রে বিশ্ব পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাজতন্ত্রের পক্ষে থাকলে পক্ষে অপরাপর পরাশক্তি রাশিয়া-চীনের অবস্থান হবে তাতো নিশ্চতই ।।

আরও পড়ুন: জাতিসংঘে দুই ব্লকে চীন ও জার্মানি ।। China and Germany in two blocs at the UN

No comments

Please do not enter any spam link in the comment box.

Powered by Blogger.